3

নেপালের সাম্প্রতিক দুর্যোগ নিয়ে কিছু ভাবনা

নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের খবরগুলো দেখার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে বারবার ভাবছি। উন্নয়ন ও মানুষের জীবিকা নিয়ে মাঠপর্যায়ে…
Uncategorized

নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের খবরগুলো দেখার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে বারবার ভাবছি। উন্নয়ন ও মানুষের জীবিকা নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে আমার কাছে মনে হয়েছে, আমরা অনেক সময় দুর্যোগকে শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবেই দেখি। কিন্তু বাস্তবে একটি প্রাকৃতিক ঘটনা কখন বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেবে, সেটার সঙ্গে আমাদের প্রস্তুতি, পরিকল্পনা, উন্নয়নের ধরন এবং পরিবেশের প্রতি আমাদের আচরণেরও অনেক সম্পর্ক আছে।

নেপালের আগস্ট ২০২৬-এর এই দুর্যোগটিকেও আমি সেভাবেই দেখছি।

নেপাল এমনিতেই ভৌগোলিকভাবে খুব ঝুঁকিপূর্ণ একটি দেশ। একদিকে খাড়া পাহাড় ও দুর্বল ভূতাত্ত্বিক গঠন, অন্যদিকে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি নদীর প্রবল স্রোত—সব মিলিয়ে সেখানে ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি অনেক বেশি। এর সঙ্গে এখন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও যোগ হয়েছে। হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বাড়ছে, হিমবাহের পরিবর্তন হচ্ছে, বরফ ও মাটির স্বাভাবিক স্থিতিশীলতাও অনেক জায়গায় আগের মতো নেই। এর সঙ্গে যখন অস্বাভাবিক বা অতিবৃষ্টি যোগ হয়, তখন পরিস্থিতি খুব দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সবকিছুর দায় শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর দিয়ে দিলে আমাদের নিজেদের দায়িত্বটা এড়িয়ে যাওয়া হয়। কেনন, প্রকৃতির ঝুঁকি আমরা হয়তো পুরোপুরি বন্ধ করতে পারব না, কিন্তু সেই ঝুঁকি কতটা বড় দুর্যোগে পরিণত হবে, সেটার অনেকটাই নির্ভর করে আমরা আগে থেকে কতটা প্রস্তুত ছিলাম তার ওপর।

আমরা জানি-বর্তমান দিনে প্রযুক্তি অনেক এগিয়েছে, স্যাটেলাইট, রিমোট সেন্সিং, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, নদীর পানি পরিমাপ, বিভিন্ন ধরনের সেন্সর—এসবের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া সম্ভব। কোথাও অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে কিংবা নদীর পানি দ্রুত বাড়তে থাকলে আগেই মানুষকে সতর্ক করা সম্ভব।

প্রযুক্তির বদৌলতে এতোকিছু করা সম্ভব হলে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে—

“এত প্রযুক্তি, এত তথ্য এবং এত সক্ষমতা থাকার পরও যদি আমরা সময়মতো মানুষকে সতর্ক করতে না পারি, তাহলে সেই প্রযুক্তির আসল মূল্য কোথায়”?

আমার মতে, নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় একটি কার্যকর Early Warning System থাকলে ক্ষয়ক্ষতির একটা বড় অংশ হয়তবা কমানো সম্ভব হতো। কয়েক ঘণ্টা আগে যদি মানুষ জানতে পারে যে তাদের এলাকা প্রাকৃতিক দূর্যোগের ঝুঁকির মধ্যে আছে, তাহলে অনেক পরিবার নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে পারে, মানুষের অন্ততপক্ষে জীবন বাঁচানোর সুযোগটা তৈরি হয়।

উন্নয়ন প্রকল্পে এবং মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে একটা বিষয় আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, এবং ভালোভাবে বুঝেছি—দুর্যোগের পরে মানুষের পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু দুর্যোগের আগে ঝুঁকি কমানোর জন্য কাজ করা আরও বেশি প্রয়োজন।

স্বভাবতই আমরা দুর্যোগের পর ত্রাণ, উদ্ধার ও পুনর্বাসন নিয়ে বেশি আলোচনা করি। কিন্তু দুর্যোগের আগে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করা, কোথায় নিরাপদ আশ্রয় আছে তা নিশ্চিত করা, স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্থানীয় পর্যায়ে উদ্ধার সক্ষমতা তৈরি করা এবং দ্রুত সতর্কবার্তা পৌঁছানোর বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দেয়া উচিত।

আরেকটি বিষয় আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ—দুর্যোগের অর্থনৈতিক ক্ষতি। কেননা অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করার কারণে বিষয়টি হয়তো আমি একটু অন্যভাবে দেখি—

একটি সেতু ভেঙে গেলে আমরা হয়তো বলি- এত টাকা ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু আসল ক্ষতি কি শুধু সেতুটির নির্মাণমূল্য?

• সেতু ভেঙে গেলে একজন কৃষক তার ফসল বাজারে নিতে পারে না।

• একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ক্রেতা হারায়।

• একজন শ্রমিক কাজে যেতে পারে না।

• শিশুর স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

• কোনো অসুস্থ মানুষ সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে না।

অর্থাৎ, একটি রাস্তা বা সেতু নষ্ট হওয়ার প্রভাব শুধু অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ধীরে ধীরে তার প্রভাব মানুষের আয়, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির ওপর গিয়ে পড়ে।

আর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এই ক্ষতির অনেকটাই আমরা হিসাবের মধ্যে আনতে পারি না।

একটি ভেঙে যাওয়া ঘরের মূল্য হিসাব করা যায়। একটি সেতু পুনর্নির্মাণে কত টাকা লাগবে, সেটাও হিসাব করা যায়। কিন্তু একটি পরিবার কয়েক মাস বা কয়েক বছর যে আয় হারাল, একটি শিশু যে সময়টা স্কুলের বাইরে থাকল, একজন ছোট উদ্যোক্তা যে কারণে তার ব্যবসা বন্ধ করে দিলেন—এসব ক্ষতির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করা অনেক কঠিন।

এ কারণেই আমার মনে হয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে শুধু ত্রাণ বা মানবিক সহায়তার বিষয় হিসেবে দেখলে হবে না। এটাকে আমাদের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

আরেকটি বিষয়ও আমাদের মনে রাখা দরকার-

হিমালয়, পাহাড় এবং এই অঞ্চলের নদীগুলো কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নেপালে পাহাড় ধস বা হিমবাহের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব অনেক সময় সীমান্ত পেরিয়েও যেতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর নদী, পানি, কৃষি এবং মানুষের জীবন একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই নেপাল, ভারত, চীন, বাংলাদেশসহ এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে দুর্যোগসংক্রান্ত তথ্য বিনিময়, নদী পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থায় আরও কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।

নেপালের এই দুর্যোগ আমাদের বাংলাদেশের জন্যও একটা সতর্কবার্তা-

আমরা অনেক সময় ভাবি, পাহাড় ধস বা হিমবাহের সমস্যা নেপালের—বাংলাদেশের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক?

আসলে জলবায়ু পরিবর্তন কোনো দেশের সীমানা মানে না। হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তন, অতিবৃষ্টি কিংবা নদীর প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় পড়তে পারে।

সবশেষে আমার নিজের উপলব্ধিটা খুব সহজ—

দুর্যোগ হয়তো আমরা থামাতে পারব না, কিন্তু দুর্যোগ যেন মানুষের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয়ে পরিণত না হয়, সেই ঝুঁকি অনেকটাই কমাতে পারি।

যে-সকল পদক্ষেপ গ্রহন করা উচিত বলে আমি মনে করি-আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশ ও দুর্যোগের ঝুঁকিকে আরও গুরুত্ব দেয়া উচিত। রাস্তা, সেতু, পর্যটন অবকাঠামো কিংবা বিদ্যুৎ প্রকল্প করার সময় শুধু আজকের প্রয়োজন আর অর্থনৈতিক লাভ দেখলে হবে না। আগামী দিনের জলবায়ু ঝুঁকি কী হতে পারে, সেটাও ভাবা উচিত। কেননা-প্রকৃতি তার নিজের নিয়মেই চলবে। কিন্তু আমরা যদি সেই নিয়মকে না বুঝে উন্নয়ন করি, তাহলে একসময় আমাদের করা উন্নয়নই নতুন ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

নেপালের এই ভয়াবহ দুর্যোগ একটা বিষয় স্পষ্ট মনে করিয়ে দেয়—

দুর্যোগের পরে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করার চেয়ে, দুর্যোগের আগে মানুষের জীবন ও জীবিকা রক্ষায় বিনিয়োগ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আর প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিতে বিনিয়োগকে শুধু খরচ হিসেবে দেখা উচিত নয়, এই বিনিয়োগ মানুষের জীবন, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ রক্ষার বিনিয়োগ।

নেপালের এই মর্মান্তিক দুর্যোগে যারা তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন, তাদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। যারা ঘরবাড়ি, জীবিকা হারিয়ে এখনও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন, তাদের প্রতিও রইল আন্তরিক সহমর্মিতা।

প্রশ্ন থেকে যায়- প্রকৃতি আমাদের বারবার সতর্ক করছে, আমরা সেই সতর্কবার্তা থেকে কতটা শিখছি এবং আমলে নিচ্ছি?

9s2zd

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *